Story

ব্রিটিশ শাসিত ভারতে নামি দামি বিদেশি কোম্পানিও হার স্বীকার করেছিল পার্লে- জি’র কাছে! ২০০৩ সালে বিশ্বের সব চেয়ে বেশি বিক্রিত বিস্কুট ব্র্যান্ডের তকমা পেয়েছিলো পার্লে

৯০ দশকের ছেলেমেয়েরা প্রত্যেকেই পার্লে- জি বিস্কুট এর সঙ্গে অতি পরিচিত। এখনো পার্লে- জি বিস্কুটের নাম শুনলে তারা তাদের নস্টালজিয়া খুঁজে পায়। ৯০ দশকের ছেলেমেয়েদের প্রায় প্রত্যেকেরই স্কুলের টিফিন হিসেবে মাঝেমধ্যেই এই গ্লুকোজ বিস্কুট টি থাকতো। ছোটবেলার গ্লুকোজ বিস্কুট গুলির মধ্যে পার্লে- জি অন্যতম। একসময় দেশের নাম্বার ওয়ান গ্লুকোজ বিস্কুট হিসেবে পরিচিত ছিল পারলে জি। বাবা-মায়েরা সকাল হোক বা বিকেল ছেলেমেয়েদের জন্য এক গ্লাস গরম দুধের সঙ্গে পার্লে- জি বিস্কুটের উপরেই ভরসা রাখত।

বর্তমান যুগের বিভিন্ন ধরনের নামিদামি ব্র্যান্ডের বিস্কুট বেরিয়েছে ঠিকই তবে এখনো পার্লে- জি নামে অনেকেরই জিভে জল চলে আসে, অনেকেই তারা তাদের ছোটবেলা খুঁজে পায়। ৯০ দশকে ঘরে ঘরে পার্লে- জি বিস্কুট ছিল অন্যতম একটি বিস্কুট। অতিথি আপ্যায়ন থেকে শুরু করে ছোটদের মন জয় করা সবেতেই পার্লে- জি বাজিমাত করত। তবে এই পার্লে- জি বিস্কুটের শুরু কোথা থেকে, কে তৈরি করল এই অসাধারণ বিস্কুট? আসুন জেনে নেওয়া যাক পারলে জি বিস্কুট এর গল্প।

সালটা ছিল ১৯২৯। মুম্বাইয়ের এক ব্যবসায়ী মোহনলাল দয়াল হঠাৎই ঠিক করলেন তিনি বেকারির ব্যবসা শুরু করবেন। এর আগে তিনি রেশম ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, হঠাৎই তার মতের পরিবর্তন হয়। কিন্তু তখনকার দিনে বেকারির ব্যবসা শুরু করবো বলেই তো হঠাৎ করে শুরু করে দেওয়া যেত না। মেশিন চাই, চাই কেক বিস্কুট বানানোর জন্য দক্ষ কারিগর। যা তখনকার দিনে খুবই মুশকিল ছিল। দেশি কেক-বিস্কুট বলতে তখন বিলিতি খাবার-দাবার কে বোঝানো হতো। সবাই ভাবতো দামি বিদেশ থেকে আসা খাবার। সেই কেক বিস্কুট বানানোর জন্যই কাঠ খড় পোড়াতে হয়েছিল মোহনলাল কে। বেকারি ব্যবসা শুরু করবেন স্থির করে ফেলায় মোহনলাল জার্মানীতে পাড়ি দেন বিশেষ প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য।

যেমন ভাবা তেমনি কাজ, জার্মানীতে পাড়ি দিলেন মোহনলাল। সেখান থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে কেক বিস্কুট বানানো শিখলেন এবং তার সাথে সাথে সেই সময়ের ৬০০০০ টাকা মূল্যের কেক বিস্কুট বানানোর বিশেষ মেশিন কিনলেন। মুম্বাই শহরের ইরলা ও পারলা নামক দুই গ্রামের মাঝে একটি কারখানা তৈরি হলো। সে কারখানাতেই বসলো মেশিন। ১২ জন কারিগরকে নিয়ে তিনি প্রথম কাজ শুরু করেন। নিজে হাতে ধরিয়ে সেই ১২ জনকে কেক বিস্কুট বানানোর প্রশিক্ষণ দেন। এমনকি নিজের পরিবারের লোক কেও এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করলেন তিনি। কোম্পানির নাম রাখলেন পার্লে। মোহনলালের কারখানায় তৈরি প্রথম জিনিসটি হল অরেঞ্জ ক্যান্ডি, তারপর একে একে চকলেট বিভিন্ন ধরনের ক্যান্ডি বানাতে শুরু করলো। বেশ নাম করলো তার ব্যবসা, দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ল তার উৎপাদিত লজেন্স চকলেট। নকল করতে শুরু করল অনেক ব্যবসায়ী।

এরপর ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইংরেজদের একচেটিয়া রাজত্ব শুরু হলো দেশে। বিভিন্ন বিদেশি দ্রব্য বর্জনে স্বদেশীরা গর্জে উঠেছিল তখন। ঠিক তখনই বাজারে পার্লে কোম্পানি নিয়ে আসলো একদম দেশীয় উপায় বানানো গ্লুকোজ বিস্কুট, দেখতেও সুন্দর খেতেও অপূর্ব সকলের মনে ধরল সে বিস্কুট। স্বদেশী জিনিস বলে সকলেরই বেশ পছন্দ হলো সেই বিস্কুট। তবে এবার শুধু স্বদেশী নয় বিদেশী সাহেবদেরও বেশ মনে ধরলো পার্লে জি। যুদ্ধের সময় সমস্ত সৈনিকদের জন্য মোহনলালের কোম্পানি পার্লে জি বিস্কুট বানিয়েছিল।

১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীনের পরে দেশে গমের উৎপাদন এর অভাব দেখা গিয়েছিল, সেই গমের উৎপাদন এর অভাব এর প্রভাব ফেলেছিল পার্লে কোম্পানির উপরও পড়ে বেশ কিছু সময়ের জন্য বিস্কুট উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে ধীরে ধীরে সমস্ত কিছু স্বাভাবিক হলে আবার রমরমিয়ে চলতে থাকে পার্লে জি বিস্কুটের উৎপাদন।

তবে ১৯৬০ সালে এল কিছুটা বদল, পার্লে কোম্পানির সাথে টক্কর দিতে ব্রিটানিয়া নিয়ে এল তাদের গ্লুকোজ বিস্কুট গ্লুকোজ ডি। শুরু হয়ে গেল প্রতিযোগিতা, মোহনলালের কোম্পানি ঠিক করল পার্লে বিস্কুটের কিছু পরিবর্তন আনবে, বিস্কুটের প্যাকেট এর মোড়ক পরিবর্তন হলো একটি বাচ্চা মেয়ের মিষ্টি হাসি দিয়ে বানানো হলো প্যাকেজ আকর্ষণীয় প্যাকেজই হয়ে উঠল বাচ্চাদের প্রিয়। কোম্পানির লোগো লাল রঙের লেখা হলো। নতুন এই প্যাকেজ বাচ্চাদের বেশ আকর্ষণ করেছিল। ফের রমরমিয়ে বাজারে চলতে লাগলো মোহনলালের গ্লুকোজ বিস্কুট।

১৯৮২ সালের পর আরও কিছু পরিবর্তন আনল প্যাকেজিংয়ের। তখন নতুনভাবে প্লাস্টিকের প্যাকেজ ব্যবহার করা হলো বিস্কুটের মোড়ক হিসেবে। বিজ্ঞাপনে আসলো বিশেষ পরিবর্তন। দেশের সুপার হিরো শক্তিমান কে দিয়ে পার্লে- জি বিস্কুট এর বিজ্ঞাপন তৈরী করা হলো। তবে এখানে পার্লে- জি ‘জি’ বলতে শুধু গ্লুকোজ নয়, জিনিয়াসও বোঝানো হতো। এর সাথে জুড়ে দেয়া হলো নতুন ট্যাগ লাইন। হিন্দুস্তান কি তাকাট রোকো মাত, টকো মাত।

২০০৩ সালে বিশ্বের সবথেকে বেশি বিক্রিত বিস্কুটের তকমা পেয়েছিল পার্লে- জি। ২০১৩ বাচ্চাদের সুস্বাস্থ্যের জন্য বিভিন্ন জায়গায় ক্যাম্পেন করতে শুরু করলো এই কোম্পানি। ট্যাগলাইন এল বিশেষ পরিবর্তন নতুন হিসেবে রাখা হলো ‘কাল কি জিনিস’। বিজ্ঞাপন এর বিশেষ অতিথি হিসেবে কলম ধরলেন বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী গুলজার, এবং গলা মেলালেন পীযূষ মিত্র। ফের রমরমিয়ে বাজারে নিজেদের নাম করে নিল পার্লে- জি।

পার্লে- জি হলো এমন একটি বিস্কুট যা দেশের মধ্যবিত্ত বড়লোক গরিব সকলেরই ভীষণ প্রিয় এবং দামে সস্তা, খেতে সুস্বাদু হওয়ায় এটি খুব সহজেই মানুষের মনে জায়গা করে নিতে পেরেছিল। আর এখানেই পার্লে- জি র সবচেয়ে বড় সাফল্য। বর্তমান যুগের নামিদামি বিভিন্ন ধরনের বিস্কুটের ব্র্যান্ড এসেছে ঠিকই কিন্তু পারলে জি তার নিজের জায়গায় কখনোই অন্য কাউকে বসতে দেয়নি। নব্বই দশক থেকে আজ পর্যন্ত পার্লে- জি ছোট থেকে বড় সকলের মনে জায়গা করে নিয়েছে। সম্প্রতি লকডাউন এর কারণে ব্যবসায়ী কিছুটা ভাটা পড়লেও প্রতিদিন প্রায় ৪০ কোটিরও বেশি বিস্কুট উৎপাদিত হয় কোম্পানিতে।

Back to top button