বাড়ি বাড়ি দুধ ফেরি করা ছেলেটাই আজ বন্ধন ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা! জানুন চন্দ্রশেখর ঘোষের চোখে জল আনা জীবন কাহিনী

কথায় বলে ইচ্ছা থাকলেই উপায় হয়। পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত যে সকল সফল মানুষ রয়েছেন তারা কিন্তু এই সাফল্যটা একবারেই লাভ করেন নি। অনেক লড়াইয়ের পর তারা সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছেন।

আজকে জেনে নেবো এমনই এক বঙ্গসন্তানের কথা যিনি কেবলমাত্র নিজের একার প্রচেষ্টায় আজ দেশের একটি অন্যতম বেসরকারি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা। একজন দুধ বিক্রেতা থেকে ভারতের অন্যতম ব্যাংকের সিইও-ফাউন্ডার হয়ে ওঠার লড়াই কাহিনী শুনে চোখ ভিজবে আপনারও।

কথা হচ্ছে, বন্ধন ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রশেখর ঘোষকে নিয়ে। আজ থেকে ছয় বছর আগে তৈরি হওয়া বন্ধন ব্যাংকের গোটা দেশ জুড়ে এখন ব্রাঞ্চ সংখ্যা ৫৩৭১। দেশের ৩৪ টি রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই ব্যাংকের ব্রাঞ্চ রয়েছে। এখন বন্ধন ব্যাংকের রেভিনিউয়ের পরিমাণ ৭৮.৭৩ বিলিয়ন।

কিন্তু লড়াইটা এত সোজা ছিল না। ১৯৬০ সালে বৃহত্তর ত্রিপুরার এক গ্রামে চন্দ্রশেখর ঘোষ জন্মগ্রহণ করেন। ১৫ জনের একান্নবর্তী পরিবারে বেশ কষ্ট করেই দিন কাটত তাদের। ছয় ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই ছিলেন চন্দ্রশেখর ঘোষ।

তাদের ছিল পারিবারিক মিষ্টির দোকান। একটা সময় পড়াশোনার খরচ চালাতে হিমশিম খেতেন চন্দ্রশেখর বাবু। শেষে বাড়ি বাড়ি দুধ ফেরি করতে শুরু করেন তিনি। এরপর টিউশনি পড়ানো শুরু করেন এই মেধাবী ছাত্র। এভাবেই অভাবের সঙ্গে লড়াই করে বড় হতে থাকেন চন্দ্রশেখর বাবু।

ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৮৫ সালে স্ট্যাটিসটিকসে মাস্টার্স করেন চন্দ্রশেখর ঘোষ। এরপর বাংলাদেশের BRAC সংস্থায় যোগ দেন তিনি। সেখানে তিনি যা দেখতে পারে তা থেকেই পরবর্তীকালে বন্ধন ব্যাংক তৈরির কথা মাথায় আসে তার। গ্রামের হতদরিদ্র গৃহবধূরা যেভাবে তাদের স্বামীদের দ্বারা অত্যাচারিত হন তা চোখের সামনে দেখতে পান চন্দ্রশেখর ঘোষ।

বস্তুত BRAC হল বাংলাদেশের নারীদের উন্নয়নের জন্য কাজ করা একটি সংস্থা। তিনি বুঝতে পারেন যে এই মহিলাদের হাতে যদি অর্থ থাকে তাহলে তারা স্বামীর অত্যাচার থেকে চিরদিনের মতো মুক্তি পেতে পারে।

তিনি পশ্চিমবঙ্গের ভিলেজ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি নামে একটি এনজিও’র সঙ্গেও দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন। এরপরই তিনি পশ্চিমবঙ্গে মহিলাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলার জন্য একটি মাস্টার প্ল্যান তৈরি করেন যা হল মাইক্রোফিনান্স।

২০০১ সালে বন্ধন কোন্নগর নামে তিনি একটি সংস্থা খোলেন এবং দরিদ্র মহিলাদের দু’লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া শুরু করেন। তিনি হুগলি জেলার গ্রামে গ্রামে নিজে গিয়ে মহিলাদের বোঝাতে শুরু করেন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া কতটা দরকারি। তবে তিনি জানিয়েছেন যে মহিলারা তাকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করেছিলেন।

এরপর ২০০৯ সালে তিনি বন্ধনকে নন ফিন্যান্স ইনস্টিটিউশন হিসেবে নথিভুক্ত করেন। এরপর ২০১৪ সালে ভারতের প্রথম মাইক্রোফিন্যান্স সংস্থা হিসাবে ব্যাংকিং লাইসেন্স লাভ করে বন্ধন। শুরু হয় এর পথচলা।

তার সম্পর্কে একটা ছোট্ট মজার গল্প বলা যাক। বন্ধন: দ্য মেকিং অফ আ ব্যাংক নামে বইতে তমাল বন্দোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় পর্যাপ্ত টাকা না থাকার কারণে চন্দ্রশেখর ঘোষ ক্যাম্পাসের মন্দিরে থাকতেন। একদিন ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস থেকে তার সাইকেল চুরি হয়ে যায়। তখন স্ট্যাটিসটিকসের এক অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন তাকে নিজের পুরনো ফিনিক্স সাইকেলটি ধার দেন। সেই সময় চন্দ্রশেখর ঘোষের মুখের হাসি ফিরে আসে। আজ সেই চন্দ্রশেখর ঘোষের গ্যারেজে টয়োটা ফরচুনার, ল্যান্ড রোভারের মত গাড়ি রয়েছে।

তাই বাঙালি ব্যবসা পারে না এই কথাটা একদম ভুল। চন্দ্রশেখর ঘোষের মত মানুষরাই বাঙালির অনুপ্রেরণা যারা লড়াই করে বাণিজ্য জগতে নিজেদের নাম উজ্জ্বল করেছেন।