Lopamudra Mitra: ‘জিন্স টিশার্ট পরে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইলে সমস্যা কোথায়?’

বাঙালি পরিবারের রেওয়াজ মতো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখার সঙ্গে তাঁর পরিচয় শৈশবেই৷ বললেন, লোপামুদ্রা মিত্র৷ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গভীর ভাবে আত্মস্থ করেছেন, উপলব্ধি করেছেন তাঁর সৃষ্টিকে৷ বয়স যত বেড়েছে, পাল্টে গিয়েছে উপলব্ধির মাত্রা৷ শিল্পী বলেই সব সময় সুরের সঙ্গে সহবাস নয়৷ লোপামুদ্রার খুব পছন্দ, রবি ঠাকুরের গানকে কবিতার মতো করে পড়াও৷ ফোনের ওপার থেকে ভেসে এল উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ, ‘‘গীতবিতান আমি গল্পের বইয়ের মতো পড়ি৷ আমার বিছানার পাশেই রাখা থাকে৷ এমনই অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, গীতবিতান ছাড়া জীবনকে ভাবতেই পারি না৷’’

যদি শিল্পী না হতেন? এভাবেই জীবনের অঙ্গ হত গীতবিতানের অক্ষরগুলি? গায়িকার জবাব, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নৈকট্য তৈরির জন্য শিল্পী হওয়া আবশ্যিক নয়৷ ‘‘বাঙালির মানসিক সমস্যা দূর করার চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে গীতবিতানে৷ আধ্যাত্মিক উত্তরণ, দুঃখ দুর্দশা থেকে মুক্তি-সবকিছুর উত্তর তাঁর গান৷’’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অগাধ সৃষ্টি সমুদ্রের মধ্যে লোপামুদ্রার সবথেকে প্রিয় তাঁর গান৷ সেইসঙ্গে বাকি সৃষ্টি তো আছেই৷ তাই বলে রবীন্দ্রসঙ্গীতের বিশুদ্ধতা পরীক্ষার জন্য কষ্টিপাথরের হাজিরা তাঁর অপছন্দ৷ ‘বিশুদ্ধ’ শব্দটা তাঁর কাছে আপেক্ষিক৷ বললেন, ‘‘ রবীন্দ্রসঙ্গীতের মতো আধুনিক গান বিরল৷ নতুন ধরনের যন্ত্রানুসঙ্গ তাঁর গানে ব্যবহার করলে ক্ষতি কোথায়?

আমি কিন্তু একে পরীক্ষা নিরীক্ষাও বলি না৷ বরং, আমার মনে হয়, এ হল গানটিকে সমসাময়িক শ্রোতার কাছে নতুনভাবে পেশ করা৷’’

গানের সঙ্গে মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট নতুন ভাবনার হলেও মূল রবীন্দ্রসঙ্গীতটিকে অবিকল রেখেই গাওয়ার পক্ষপাতী লোপামুদ্রা৷ তিনি মনে করেন, গান গাওয়ার সময় স্রষ্টাকে সম্মান জানানো, তাঁর সম্মান রক্ষা করাও শিল্পীর দায়িত্ব৷

কিন্তু সেই ঘেরাটোপে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে তিনি আজকের দিনেও কোনও অলিখিত পোশাকবিধির নিগড়ে বেঁধে রাখার পক্ষপাতী নন৷ ‘‘এক জন তরুণ বা তরুণী যদি জিন্স টি-শার্টে স্বচ্ছন্দ হয়ে, পোশাক ঠিকমতো ক্যারি করে শালীনভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করেন, তা হলে সমস্যা কোথায়?’’ প্রশ্ন লোপামুদ্রার৷ গানের সঙ্গে পোশাকের সম্পর্ক কী, বুঝতে পারেন না তিনি৷ নিজে শাড়ির ভক্ত হয়েও লোপামুদ্রা মনে করেন, রবীন্দ্রসঙ্গীতের জন্য ঢাকাই শাড়ি আর কেশসজ্জায় ফুল, অথবা পায়জামা-পাঞ্জাবী, এই অলিখিত ড্রেসকোডের কোনও অর্থ তাঁর কাছে নেই৷

অর্থহীন বলে মনে হয় রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্নও৷ তাঁর কথায়, ‘‘ সব পরিস্থিতির জন্য গান লিখে গিয়েছেব রবি ঠাকুর৷ এই অতিমারির মধ্যে ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো’, ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’ অথবা ‘আমি মারের সাগর পাড়ি দেব’-এই গানগুলোর মতো মানসিক শক্তি আর কে দেবে বলুন তো?’’ প্রশ্ন তাঁর৷ রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে, রবীন্দ্রনাথের জন্য আজও কত জন নিজেদের পেশা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন৷ বাঙালির অন্যতম ইন্ডাস্ট্রি তিনি৷ তাঁর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে যদি প্রশ্ন করাদের জন্য ব্যঙ্গের তির্যক হাসিই উপহার লোপমুদ্রার৷